logo

জাতীয় পাঠ্যক্রম ভিত্তিক

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য শ্রেষ্ঠ অনলাইন পড়াশুনা

সিলেবাস, কারিকুলাম ও পরীক্ষা নিয়ে কিছু কথা

আপডেট: অক্টোবর ০৯,২০১৬ ‌ | ক্যাটাগরি: বিবিধ

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা জ্ঞানের পথ হারিয়ে এখন ভিন্ন পথে।কী শেখা হলো বা না হলো- সে আজ অনেকের বিবেচ্য নয়। আজ তাদের কাছে বিবেচ্য-পরীক্ষার রেজাল্ট।জিপিএ ফাইভ পাবার জন্য কেবল শিক্ষার্থী নয়, তার শিক্ষক ও অভিভাবক পর্যন্ত মরিয়া।যে করে হউক জিপিএ ফাইভ না পেলে নয়। ঘুম থেকে উঠেই বইয়ের ব্যাগ কাঁধে কোচিং সেন্টার কিংবা প্রাইভেট টিউটরের কাছে শুরু হয় দৌড়।সাত-সকালে সোনামনিদের দৌড়-ঝাঁপ প্রতিযোগিতা ! নোট-গাইড আর কোচিং আমাদের বাচ্চাদের মাথা খেয়ে একদম বরবাদ করে দিচ্ছে । সন্তানের প্রতি অভিভাবকের মনোভাব যেন এই,তুমি বাঁচো কিংবা মরো -তবু এ প্লাস চাই। এ করে করে এ ক’বছরে এ প্লাসে দেশটা ভরে গিয়েছে।

কিন্তু, জ্ঞানের কোঠা দিনে দিনে শুন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।যে শিক্ষক জ্ঞানের পথ দেখান, তিনি আজকাল ভাল শিক্ষক বলে গণ্য হন না। যিনি পরীক্ষা পাসের পথ দেখিয়ে দিতে পারেন, তিনিই নামী-দামী শিক্ষক।যিনি যত বেশী কোচিং পড়ান, তিনি তত ফেভারিট।আমাদের স্কুল-কলেজে কিছু শিক্ষক কোচিংয়ে জড়িয়ে কেবল তারা নন, দেশের সকল শিক্ষককে কলংকিত করছেন।যারা কোচিংয়ের স্বাদ পেয়ে গেছেন, তারা আর কোচিং বাণিজ্য থেকে ফিরে আসতে পারেন না। কোচিং ব্যবসা চালাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দেযা লাগে।

আমাদের শিক্ষা থেকে নৈতিক শিক্ষা অনেকটা দূরে চলে গেছে এবং দিনে দিনে উধাও হয়ে যাচ্ছে ।লেখাপড়া করে ও অনেকে মাস্তান ও সন্ত্রাসি বনে যায় । কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে চাকরি নিয়ে অনেকে দুর্নীতিতে গেড়ে বসে । টাকা ছাড়া কোন কাজে হাত দেয় না। বিনে পয়সায় ফাইল এক চুল ও নড়ে না।সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদে শিক্ষিত প্রজন্মের সম্পৃক্ততা আমরা বিস্ময়ে লক্ষ্য করি।

বইয়ের বোঝা দিন দিন বেড়েই চলেছে । বেশী বইয়ে কার লাভ, জানিনে?তবে,শিক্ষার্থীদের কোন লাভ নেই বরং ক্ষতি।আমাদের ‘এনসিটিবি’ তা ভাল বলতে পারবে।মাননীয় প্রধান মন্ত্রি এর কুফল অনুধাবন করে বইয়ের সংখ্যা কমাবার কথা বহুবার বলেছেন।কিন্তু, তারপর ও পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা দিন দিন কেন যে বেড়েই চলেছে ?

ইংরেজি আমাদের দেশে সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ।বিশ্বায়নের এ যুগে ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব পৃথিবীর কোথাও কম নেই। কিন্তু, আমাদের দেশে ইংরেজি শিক্ষা এবং তা শেখানোর ক্ষেত্রে অনেকটা অবহেলা পরিলক্ষিত।আগের মত ইংরেজি বিষয়ে শব্দার্থ শেখার সুযোগ নেই।এক সময় পরীক্ষায় শব্দার্থে ১০ নম্বর থাকতো। তখন ১০ নম্বরের দশ শব্দের জন্য অবলীলায় কয়েক শ’ শব্দ যে কেউ শিখে নিত । Translation শেখা বাধ্যতামুলক ছিল। পরীক্ষায় দু’ধরণের ইংরেজি translation আসতো । Passage translation ও detached sentence-এর translation. এ সব translation শিখে শিখে বলতে গেলে অনেক ইংরেজি শেখা হয়ে যেতো। এখন বি,এ-এম,এ পাস করে ও অনেকে সাধারণ ইংরেজিটুকু বুঝে না কিংবা ইংরেজিতে দু’চারটে কথা বলতে পারে না। তখন এসএসসি মাত্র পাস করে ও কেউ কেউ সুন্দর করে ইংরেজি বলতে পারতেন। আমাদের দেশে এমনিতেই বর্তমানে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না। তদুপরি , গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে এরশাদ সরকারের আমলে ডিগ্রী ক্লাসে ইংরেজি বিষয়টি অপশনাল করে দেয়ার ফলে অনেকে ইংরেজি ছাড়াই ডিগ্রি পাস করে । সে সময়কার ডিগ্রি পাস বেশীর ভাগ এখন বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক। তারা অনেকেই আবার ইংরেজির ও শিক্ষক।তারা ইংরেজি ছাড়া ডিগ্রী পাস করে এখন কতটুকু-কী ইংরেজি পড়াতে পারেন, সে সব তো তারা নিজেরাই ভাল বলতে পারেন?

শিক্ষার্থীর বয়স,মেধা,রুচি,চাহিদা ও আকাঙ্খার দিকে খেয়াল রেখেই আগেকার সময়ে পাঠ্যপুস্তক প্রনীত হতো।ইদানিং সময়ে এ বিষয়গুলো তেমন বিবেচনায় থাকে বলে মনে হয় না । আজকাল প্রাইমারি সমাপনী পরীক্ষার পাঠক্রম, পাঠ্যসূচী ও প্রশ্নের ধরণ দেখলেই এর সত্যতা বুঝা যায়। প্রাইমারি সমাপনির ইংরেজি সিলেবাস কিংবা পাঠ্য বইটা আগের সময়কার নবম-দশম শ্রেণির সিলেবাস কিংবা পাঠ্য বইয়ের চেয়ে কম কঠিন নয়।

বই পুস্তকে নৈতিক শিক্ষামূলক পাঠ কমিয়ে কেবল ধর্ম শিক্ষা বিষয়টির নামের সাথে নৈতিক শিক্ষা যোগ করে কী লাভ ? প্রতিটি ধর্মের সকল বিষয়ই তো নৈতিকতা সম্পন্ন । সুতরাং ‘ইসলাম শিক্ষা’ বইটির নাম ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ লিখে কী হবে ? আবার ‘হিন্দু শিক্ষা’ বইটিকে ‘হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ বলে কী বুঝানো হচ্ছে না যে, ধর্মে যেটুকু নৈতিকতার ঘাটতি আছে, তা এ ক্ষেত্রে সংযোজিত হয়েছে ? আমরা জানি, কোন ধর্মেই নৈতিকতার কোন ঘাটতি নেই। তা হলে বৈপরীত্য কেন?

আমাদের পরীক্ষা যেন আজ এর সকল বৈশিষ্ট হারাতে বসেছে।একেকটা বেঞ্চে চার-পাঁচ জন বসে পরীক্ষা দেয়। সামনে-পেছনে তেমন একটা ফাঁক রাখা যায় না । যেখানে সেখানে পরীক্ষা সেন্টার।আগে কেবল জেলা সদরে পরীক্ষা সেন্টার থাকতো। এখন পরীক্ষা হলে কোথাও আবার পরীক্ষার্থীগণ বেপরোয়া।কোথাও কোথাও শিক্ষক লাঞ্চিত পর্যন্ত হন । বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হর হামেশাই হয়। শিক্ষক অনেক জায়গায় একান্ত অসহায়। বলাবলি-দেখাদেখি করে লেখার প্রবণতা বেড়ে চলেছে । সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তরে যা-তা লিখে পাস নম্বর পাওয়া সমীচিন হয় কী করে ? এমনিতেই বহুনির্বাচনি প্রশ্নের উত্তর নানা সংকেতে একজন দশ জনকে জানিয়ে দেয়।ব্যবহারিক পরীক্ষা না নিয়েই কেবল খাতা দেখে মার্কস দিয়ে দেয়া হয় কোথাও কোথাও।তাই তো পরীক্ষায় পাসের হার ১০০% এর অতি কাছাকাছি।

আজকাল অনেক শিক্ষার্থী বই নিয়ে পড়তে বসতে চায় না।নোট-গাইড থেকে হুবহু প্রশ্ন পরীক্ষায় এলে তারা কোন দুঃখে বই নিয়ে পড়তে বসবে ? এ ক্ষেত্রে নোট-গাইড তো তাদের অবলম্বন হবেই।

এ সব বিষয় নিয়ে এখনই আমাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভাবতে হবে । তা না হলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে আমরা বাঁচাব কী করে ? একটি যুগোপযোগি কারিকুলাম ও সিলেবাস না থাকলে শিক্ষার কাঙ্খিত

লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। পরীক্ষা হতে হবে কেবল জ্ঞান যাচাইয়ের মাধ্যম, অন্য কিছুর নয়।

সুত্রঃ দৈনিক শিক্ষা

ক্যাটাগরি

সাম্প্রতিক তথ্যসমূহ