logo

জাতীয় পাঠ্যক্রম ভিত্তিক

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য শ্রেষ্ঠ অনলাইন পড়াশুনা

উত্তরপত্র মূল্যায়নে গাফিলতি: ব্যবস্থা নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ

আপডেট: অক্টোবর ০৯,২০১৬ ‌ | ক্যাটাগরি: বিবিধ

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অবহেলাকারী পরীক্ষকরা ফেঁসে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে যে সকল পরীক্ষক দায়িত্বে গাফিলতি করেছেন তাদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সেই তালিকা ধরে এমপিও (বেতনের সরকারি অংশ/মান্থলি পে অর্ডার) বাতিল করা  হবে। কেবল তাই নয় সংশ্লিষ্ট পরীক্ষককে ভবিষ্যতে খাতা মূল্যায়ন (উত্তরপত্র) করা থেকে বিরত রাখা হবে।

প্রতিবছরই পরীক্ষকদের ভুলের শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার পরীক্ষার্থী। আগামীতে এ ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তিরোধে এ উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ডগুলো।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, দায়িত্বে অবহেলাকারী বা গাফিলতিকারী শিক্ষকদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। কেননা কোন শিক্ষক ভুল করলে তার ভুলের মাশুল গুনতে হয় শিক্ষার্থীদের। ফলে পরীক্ষকদের খেয়াল রাখতে হবে যাতে নির্ভুলভাবে খাতা দেখা ও নম্বর যোগ করা যায়। যাতে কোন শিক্ষার্থীর সমস্যা না হয়। খাতা দেখার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে বলে মন্তব্য করেন শিক্ষামন্ত্রী।

প্রতিবছরই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরই আপত্তি তুলে লাখো শিক্ষার্থী। অনেক সময়ই দেখা যায়, প্রকাশিত ফল মানতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও ফেল দেখানো হচ্ছে প্রাপ্ত ফলাফলে। পরবর্তীতে ঐ ফল মেনে নিতে না পেরে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

বোর্ড সূত্র জানায়, মূলত তিন ধরনের ভুল ধরা পড়েছে খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে। কিছু খাতায় নম্বরের যোগফল ঠিক ছিল না, কিছু উত্তরের নম্বরও যোগ করা হয়নি, ওএমআর ফরমে বৃত্ত ভরাটেও ভুল।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর এইচএসসির পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশিত হয়। এতে দশ বোর্ডে আড়াই হাজার শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। পুননিরীক্ষণে প্রত্যেকের ফলই আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৯ জন শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। ঢাকা বোর্ডে নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১১৫ জন এবং ফেল করা থেকে পাস করেছে ২০৪ জন পরীক্ষার্থী।

জানা গেছে, এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছিল আট লাখ ৯৯ হাজার ১৫০ জন এবং জিপিএ ৫ পায় ৫৮ হাজার ২৭৬ জন। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৩২২টি উত্তরপত্র পুননিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বোর্ডে এক লাখ ৪০ হাজার, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৫৫ হাজার, রাজশাহী বোর্ডে ৪০ হাজার, কুমিল্লা বোর্ডে ৩২ হাজার, যশোর বোর্ডে ৩১ হাজার, সিলেট বোর্ডে ১৭ হাজার, বরিশাল বোর্ডে সাড়ে ১৯ হাজার, দিনাজপুর বোর্ডে সাড়ে ২৭ হাজার, মাদ্রাসা বোর্ডে ১২ হাজারের মতো উত্তরপত্র পুননিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে শিক্ষার্থীরা।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ৩২৮ জনের ফল পরিবর্তন হয়েছে। নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৩৯ জন। এ ছাড়া ফেল করা থেকে পাস করেছে ৮৬ জন। যশোর বোর্ডে ফল পরিবর্তন হয়েছে ১৪৩ জনের। নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪১ জন। আর ফেল করা ৩৯ জন পাস করেছে।

বরিশাল বোর্ডে ৭৮ জনের ফল পরিবর্তন হয়েছে। নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে দুজন এবং ফেল করা থেকে পাস করেছে ৩০ জন।

মাদ্রাসা বোর্ডে ফল পরিবর্তন হয়েছে ১০৫ জনের। নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে আটজন এবং ফেল থেকে পাস করেছে ৩৯ জন পরীক্ষার্থী।

বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, উত্তরপত্র পুননিরীক্ষা করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল পাওয়া গেছে বৃত্ত ভরাটে। দেখা গেছে, একজন ৮৫ পেয়েছে, সেখানে উল্টো ৫৮ বৃত্ত ভরাট করা হয়েছে। একজন ১৩টি প্রশ্নের উত্তর দিলেও একটির উত্তরের নম্বর মোট নম্বরের সঙ্গে যোগ হয়নি। আবার একজন শিক্ষার্থী ৯৩ পেয়েছে বৃত্ত ভরাট করা হয়েছে ৩৯। ফলে তার জিপিএ ৫ ছুটে গেছে।

জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে যথাসময়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল ঘোষণা করা হয়। এটা করতে গিয়ে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

নাম প্রকাশ না করে একাধিক পরীক্ষক জানিয়েছেন, খাতা মূল্যায়ন করতে খুব কম সময় দেয়া হয়। রাজধানীর একটি কলেজের শিক্ষক বলেন, বোর্ড থেকে দেয়া খাতা ১৪ দিনের মধ্যে জমা দিতে হয়। এই সময়ে সর্বোচ্চ ৩০০ খাতা ঠিকমতো মূল্যায়ন সম্ভব। কিন্তু ৫০০ থেকে ৭০০ খাতা দেয়া হয়।

তিনি মনে করেন, এতেই ভুলের ঘটনা ঘটে থাকে, অনেক ক্ষেত্রে সঠিক মূল্যায়নও হয় না। এর খেসারত দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। প্রথম দফায় অনেকে ফেল বা কম জিপিএ পাচ্ছে। পরে ফল পুনঃনিরীক্ষায় ফেল থেকে পাস করছে, জিপিএ-৫ পাচ্ছে এমন নজিরও আছে।

অন্যদিকে পরীক্ষা না দিয়েও আছে পাসের দৃষ্টান্ত। এছাড়া পরীক্ষার হলে ভুল প্রশ্ন বিতরণ, ব্যবহারিক পরীক্ষায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে নম্বর কম-বেশি দেয়ার ঘটনাও ঘটছে।

অভিযোগ ওঠেছে, এ ধরনের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তা এবং কিছু শিক্ষক জড়িত। পরীক্ষা শেষে খাতা বণ্টনের সময় অনেক ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে থাকেন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তারা।

কম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষককে অধিক পরিমাণে খাতা দেয়া হয়। যোগ্য শিক্ষকদের অনেকেই বোর্ডের পরীক্ষক হতে পারেন না। উত্তরপত্র (পরীক্ষার খাতা) মূল্যায়নের জন্য সময় দেয়া হয় মাত্র ২ সপ্তাহ। এ সময়ের মধ্যে তিনশ’ খাতা ভালোভাবে দেখা সম্ভব। কিন্তু দেয়া হয় ছয়শ’ থেকে সাতশ’ খাতা। অভিযোগ আছে, সময় স্বল্পতার অজুহাতে পরীক্ষকরা অন্য ছাত্র বা পরিবারের সদস্যদের দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করিয়ে থাকেন।

নম্বর যোগ করার সময় মনোযোগ দেয়া হয় না। এতে পরিসংখ্যানগত ভুল বাড়ছে। এতে রেজাল্ট পাল্টে যাচ্ছে। অমনোযোগিতার কারণে কোনো বিষয়ে প্রাপ্ত ৮৬ নম্বর, ৬৮ হিসেবে রেজাল্ট শিটে ওঠছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন। ভুক্তভোগী ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে এসব নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক কোনো পদক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

ফেল থেকে জিপিএ ৫ পাওয়া তাসনুভার বাবা আনিসুর রহমান বলেন, ফল প্রকাশের পর থেকে আমার মেয়ে মানসিক ভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল। আমরাও ফল মেনে নিতে পারিনি। কারণ ও (তাননুভা) ক্লাসে সবসময়ই প্লেসে থাকতো। ও কোনোমতেই ফেল করতে পারে না। পরবর্তীতে পুনঃনিরীক্ষনের আবেদন করে জিপিএ ৫ পায় সে। ফল প্রকাশের পর সামাজিকভাবেও অনেক হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন আনিসুর রহমান।

এ গ্রেড থেকেই জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থী রাফসান বলেন, ফল প্রকাশের পর থেকে আমি দুশ্চিন্তায় পরে যাই। পরে আমি বোর্ড চ্যালেঞ্জ করি। পরবর্তীতে ফল পরিবর্তিত হয়ে জিপিএ ৫ পাই। ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো শিক্ষার্থীর এরকম ভুল না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্টদের জোর দেয়ার দাবি জানান ঐ শিক্ষার্থী।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান বলেন, দায়িত্বে গাফিলতিকারী পরীক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেয়া হচ্ছে। গাফিলতিকারী পরীক্ষকদের তালিকা তৈরী করা হচ্ছে। পরবর্তীতে তাদের এমপিও বাতিলের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রেরণ করা হবে। এছাড়াও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকদের ভবিষ্যতে আর খাতা মূল্যায়ন করতে দেয়া হবে না। ভবিষ্যতে কিভাবে ভুলভ্রান্তি কমানো যায় সে বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার কথা ও চিন্তা করছে শিক্ষাবোর্ডগুলো।

সূত্রঃ সংবাদ প্রতিদিন

ক্যাটাগরি

সাম্প্রতিক তথ্যসমূহ